বিয়ে না করায় ঘাড়ে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন, পরে গলা কেটে হত্যা

ভালোবেসে পরিবারের অজান্তেই শাবন্তীকে এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করেন নরসিংদীর ঘোড়াশাল দক্ষিণচরপাড়া এলাকার মো. মাঈনুল মীর।
মাঈনুলের বাড়ি পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌরসভার দক্ষিণ চরপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম মীর মো. ফেলু মীর। অপরদিকে স্ত্রী শ্রাবন্তী আক্তারের বাড়ি একই জেলার নরসিংদী সদর উপজেলায়।

কে জানতো বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায় প্রেমিকার হাতেই মাঈনুলের মৃত্যু হবে। অন্য মেয়েকে বিয়ের কথা জানতে পেরে কৌশলে মাঈনুলকে ডেকে নেয় মীম। ডেকে নিয়ে চেতনানাশক ইনজেকশন পুশ করে গলায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন প্রেমিকা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইসরাত জাহান মীম।

শনিবার সন্ধ্যায় প্রেমিকা মীমকে আটক করে পলাশ থানা পুলিশ। তদন্তকারী সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন, মীমই এ নৃশংস হত্যার মূল আসামি।

মীমের তথ্যের বরাত দিয়ে পলাশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, মীম ও মাঈনুল একই এলাকার বাসিন্দা। দু’জনেই স্থানীয় মুসা বিন হাকিম ডিগ্রি কলেজে একসঙ্গে পড়তেন। এ থেকে তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিছুদিন পর ঐ সম্পর্কে ফাটল ধরে। ফলে গত বছরের মাঝামাঝিতে মাঈনুলকে না জানিয়ে মীম অন্য ছেলেকে বিয়ে করে ফেলে।

তিন মাস পর সেই বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় বাবার বাড়ি চলে আসে মীম। পরে আবার মাঈনুলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্টতায় জড়িয়ে পড়েন মীম। কিন্তু এরই মাঝে শ্রাবন্তীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে মাঈনুলও। গোপনে একসঙ্গে দু’জনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যায় মাঈনুল। এরপর স্ত্রী শাবন্তীকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন।

খবর পেয়ে ৭ ফেব্রুয়ারি শ্রাবন্তীর বাবা ও ফুফাসহ আরো স্বজনরা হঠাৎ ঘোড়াশালে মেয়ের জামাইয়ের বাসায় উপস্থিত। তারা মেয়েকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টাও চালায়। এতে কোনোভাবেই মেয়ে শাবন্তী যেতে রাজি হয়নি। অবশেষে মেয়েকে ছাড়াই ফিরতে হলো তাদের।

বাড়ির পাশেই ঘোড়াশাল বাজারে ‘টুথ অফিস’ নামে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে যাওয়ার কথা বলে বৃহস্পতিবার বাসা থেকে বের হয় মাঈনুল। রাতেও বাড়ি ফেরেনি। স্ত্রী ও স্বজনরা কল করে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পেয়ে চিন্তায় পড়ে যান পরিবারের সদস্যরা। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করে তার সন্ধান না পাওয়ায় স্থানীয় কমিশনারকে তারা বিষয়টি জানান। কমিশনার ঘটনাটি পুলিশকে অবহিত করার জন্য বলেন।

শুক্রবার সকালে মাঈনুলের স্ত্রী শ্রাবন্তী স্থানীয় পুলিশকে জানিয়ে থানায় একটি জিডিও করেন। শ্রাবন্তী পুলিশের কাছে তার সন্দেহের তীর তার নিজ বাবা আর ফুফাকেই করেছেন। কারণ, পরিবারের অসম্মতিতে বিয়ে করায় বাবা ও ফুফা তার স্বামীর ক্ষতি করতে পারেন। এরপর পুলিশ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।

মাঈনুলের কর্মস্থলেও খোঁজ নিতে গিয়ে তালাবদ্ধ থাকায় ক্লিনিকের ভেতরে কেউ থাকতে পারেন এমন কোনো সন্দেহ পুলিশের ছিল না। পরে মাঈনুলের সঙ্গে কার কার যোগাযোগ ছিল স্থানীয় ও স্বজনদের কাছ থেকে এমন তথ্য সংগ্রহ করেন পুলিশ।

এরই মধ্যে স্থানীয়দের কাছ থেকে এলাকার মীম নামে এক তরুণীর সঙ্গে মাঈনুলের প্রেমের সম্পর্কের খবর পায় পুলিশ। সেই সূত্রধরে প্রেমিকা মীমের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় মীমকে পেয়ে মাঈনুলের বিষয়ে জানতে চাইলে তার কাছে কোনো তথ্য নেই দাবি করে সাফ জানিয়ে দেন মীম। যদিও প্রযুক্তিগত তদন্তে মাঈনুলের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার তথ্য পায় পুলিশ। শনিবার বিকেল ৪টার দিকে টুথ অফিসের মালিক ডেন্টাল চিকিৎসক সিহাবুল হক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তালা খোলার পর মাঈনুলের গলা কাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।

পরে তিনি দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠান। এর পরই সন্দেহভাজন মীমকে বাসা থেকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। একপর্যায়ে মীম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সব কিছু স্বীকার করেন। মাঈনুলের বিয়ে করার কথা জানতে পেরে চেতনানাশক ইনজেকশন ক্রয় করে প্রেমিকা মীম।

এরপর মাঈনুলকে তার কর্মস্থলে ডেকে এনে তাকে বিয়ে না করার বিষয়টি জানতে চায় মীম। এ সময় মাঈনুলের ঘাড়ে ইনজেকশন পুশ করে তাকে অচেতন করে ছুরি দিয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে বাইরে থেকে তালা দিয়ে পালিয়ে যায় মীম। হত্যার পর ছুরি, মোবাইল ও সিরিঞ্জ ঘোড়াশাল এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। রোববার মীমকে আদালতে তোলা হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*